ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও সশস্ত্র সংঘাত গত বছর বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের ওপর আগের তুলনায় চাপ বাড়িয়ে তোলে। এ সময় গুরুত্বপূর্ণ রুটে বিঘ্ন ও পুনর্গঠনের পাশাপাশি শিপিং কোম্পানিগুলোর গুনতে হয়েছে বাড়তি খরচ। ইউএন ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আঙ্কটাড) ‘রিভিউ অব মেরিটাইম ট্রান্সপোর্ট ২০২৫’ প্রতিবেদন অনুসারে, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে লোহিত সাগর ও ক্যারিবিয়ানসহ একাধিক সামুদ্রিক অঞ্চলে চলাচল বাধার মুখে পড়ে। বিশ্বের জ্বালানি তেল বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতেও চলাচল বিঘ্নের ঝুঁকি দেখা দেয়। খবর আনাদোলু।
বৈশ্বিক বাণিজ্যের ৮০ শতাংশের বেশি পণ্য পরিবহন করে শিপিং কোম্পানিগুলো। খাতটি ক্রমবর্ধমান চাপের মুখোমুখি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পণ্য পরিবহনে প্রবৃদ্ধির ধীরগতি, খরচ বৃদ্ধি ও অনিশ্চয়তা খাতটিকে প্রভাবিত করেছে।
২০২৪ সালে সামুদ্রিক বাণিজ্য ২ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করে, গত বছর তা নামতে পারে দশমিক ৫ শতাংশে। আটলান্টিক কাউন্সিলের ট্রান্সআটলান্টিক সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভের সিনিয়র ফেলো এলিজাবেথ ব্রাউ বলেন, ‘সব সামুদ্রিক কার্যক্রমের জন্য ২০২৫ সাল খুবই কঠিন বছর ছিল। শুধু শিপিং নয়, সমুদ্রভিত্তিক সব বাণিজ্যিক কার্যক্রমই প্রভাবিত হয়েছে।’
সুয়েজ খালের মাধ্যমে ইউরোপ ও এশিয়াকে সংযুক্তকারী লোহিত সাগর রুট গত বছর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গাজায় আক্রমণের প্রতিবাদে ২০২৩ সালের শেষ দিকে এ রুটে চলাচলকারী ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে যুক্ত বাণিজ্যিক তরীকে লক্ষ্যবস্তু করা অব্যাহত রাখে ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী। ফলে লোহিত সাগরের কয়েক দিনের পথ এড়িয়ে জাহাজগুলো বেছে নেয় দক্ষিণ আফ্রিকার পাশের উত্তমাশা অন্তরীপ হয়ে দীর্ঘ রুট। দীর্ঘমেয়াদি এ পরিবর্তন জাহাজ ভাড়া ও বাণিজ্যিক অস্থিরতা বাড়িয়েছে। এতে সরবরাহ চেইন আরো দুর্বল হয়েছে।
২০২৫ সালের জুনে ইরান-ইসরায়েল সংক্ষিপ্ত সংঘাত তৈরি হলে শিপিং খাতে উদ্বেগ বেড়ে যায়। কারণ সংঘর্ষের মাঝপথে পড়া হরমুজ প্রণালি বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় ১১ শতাংশ এবং সমুদ্রপথে জ্বালানি তেলের এক-তৃতীয়াংশ বহন করে।
অবশ্য বৈশ্বিক শিপিং শিল্প নতুন বাস্তবতার সঙ্গে অনেকটাই খাপ খাইয়ে নিয়েছে। এলিজাবেথ ব্রাউ বলেন, ‘পশ্চিমমুখী বৈশ্বিক শিপিং এখন লোহিত সাগর বা সুয়েজ খাল ব্যবহার করছে না। উত্তমাশা অন্তরীপ হয়ে পরিচালিত হচ্ছে। দীর্ঘ রুট মানে অতিরিক্ত জ্বালানি, বেশি খরচ ও কার্বন নিঃসরণ।’
বছর শেষে নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে ক্যারিবিয়ান সাগর। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অবরোধ ঘোষণার পর ১০ ডিসেম্বর মার্কিন বাহিনী ভেনিজুয়েলার একটি ট্যাংকার জব্দ করে। ভেনিজুয়েলা ঘটনাটিকে জলদস্যুতা হিসেবে বর্ণনা করেছে। ব্রাউ বলেন, ‘ভেনিজুয়েলার মাছ ধরার জাহাজ ও শ্যাডো ট্যাংকারে হামলা বৈশ্বিক সামুদ্রিক ব্যবস্থার দিক থেকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।’
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শস্য ও জ্বালানি পণ্য বহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কৃষ্ণ সাগরের সামুদ্রিক নিরাপত্তাকে আরো ঝুঁকিপূর্ণ করেছে। একাধিক রুশ জাহাজ ও জ্বালানি সম্পদের ওপর হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। অন্যদিকে ইউক্রেনীয় বন্দর হয়ে ওঠে রুশ লক্ষ্যবস্তু।
একই সময়ে মালিকানা গোপন রেখে পরিচালিত শ্যাডো ফ্লিট ব্যবহার অতিরিক্ত ঝুঁকি তৈরি করছে। কেপলারের তথ্যানুযায়ী, প্রায় ৩ হাজার ২৪০টি জাহাজ এখন শ্যাডো ফ্লিটের অংশ। ২০২৪ সালের একটি রিপোর্টে দেখা গেছে, ২০২২ সালের পর থেকে এ ধরনের জাহাজ ২ হাজার ৮০০ শতাংশ বেড়েছে।
এলিজাবেথ ব্রাউ উল্লেখ করেছেন, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক সামুদ্রিক নিয়মাবলির প্রতি আনুগত্য কমেছে। ইউএন কনভেনশন অন দ্য ল অব দ্য সির (ইউএনক্লোস) খেলাপ হয়েছে একাধিক ঘটনায়। যেমন দক্ষিণ চীন সাগরে বেইজিংয়ের হুমকি এবং আন্তর্জাতিক জলসীমায় খনি অনুসন্ধানে মার্কিন অনুমোদন। ব্রাউ বলেন, ‘এটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, কারণ অন্য দেশও বলবে, আমরা ইউএন ক্লস মেনে চলব না। তখন সমুদ্র আরো বিপজ্জনক হয়ে যাবে।’